April 15, 2026, 5:49 pm

৪ কোটি ডিভাইসের আইএমইআই জালিয়াতি ও ডিজিটাল নিরাপত্তার চরম ঝুঁকি

রবিউল ইসলাম

বাংলাদেশের টেলিযোগাযোগ খাতের ইতিহাসে এক নজিরবিহীন ও ভয়াবহ তথ্য প্রকাশ্যে এসেছে। ন্যাশনাল ইকুইপমেন্ট আইডেন্টিটি রেজিস্টার বা এনইআইআর চালুর পর দেখা যাচ্ছে, দেশের মোবাইল নেটওয়ার্কে সচল থাকা লাখ লাখ হ্যান্ডসেটের আইএমইআই নম্বর ভুয়া, ক্লোন করা অথবা একই নম্বর দিয়ে কয়েক কোটি ডিভাইস চলছে। এই ভয়াবহ জালিয়াতির তথ্য দিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টার ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব।

শুক্রবার রাতে তার ভেরিফায়েড সামাজিক মাধ্যম থেকে দেওয়া এক বার্তায় তিনি তুলে ধরেছেন কীভাবে অবৈধ ও নিম্নমানের ফোনের বাজারে পরিণত হয়েছে দেশ।

প্রতিবেদনের সবচেয়ে চমকে ওঠার মতো তথ্য হলো, ৯৯৯৯৯৯৯৯৯৯৯৯৯৯ এই একটি মাত্র আইএমইআই নম্বরের বিপরীতে গত ১০ বছরে ৩ কোটি ৯১ লাখ ২২ হাজার ৫৩৪টি বিভিন্ন বিন্যাস (সিম ও ডিভাইস তথ্য) পাওয়া গেছে। এটি কেবল মোবাইল হ্যান্ডসেট নয়, বরং সিসিটিভি বা বিভিন্ন ইন্টারনেট অব থিংস বা আইওটি ডিভাইসের ক্ষেত্রেও হতে পারে। এ ছাড়া সাধারণ সংখ্যার গঠন যেমন ১১১১১১১১১১১১১ বা ০০০০০০০০০০০০০ নম্বরেরও লাখ লাখ ডিভাইস সচল রয়েছে বাজারে।
সরকারি তথ্যানুযায়ী, ৪৪০০১৫২০২০০০ এই নম্বরে ১৯ লাখ ৪৯ হাজারেরও বেশি নকল ডিভাইস এবং ৩৫২২৭৩MDE৭৩৮৬৩৪ নম্বরে প্রায় ১৭ লাখ ৫৮ হাজার ডিভাইস রয়েছে। এমনকি ৫ লাখ ৮৬ হাজার ৩৩১টি হ্যান্ডসেট সচল রয়েছে যার আইএমইআই নম্বর মাত্র এক ডিজিটের শূন্য। তালিকাটি বেশ দীর্ঘ, যেখানে এক লাখের উপরে সচল আছে এমন অন্তত ২৪টি ভিন্ন ভিন্ন ভুয়া আইএমইআই নম্বর শনাক্ত করা হয়েছে।

এই ক্লোন ও নকল ফোনগুলো কোনো ধরনের নিরাপত্তা পরীক্ষা বা বিকিরণ পরীক্ষা ছাড়াই বাজারে ছড়িয়ে পড়েছে। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী মোবাইল ফোনের নির্দিষ্ট শোষণ হার বা এসএআর পরীক্ষা করা বাধ্যতামূলক, যা এই ফোনগুলোর ক্ষেত্রে হয়নি। ফলে এসব ফোন ব্যবহারকারীদের দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকি ও কারিগরি বিপত্তির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। জনজীবন ও সাধারণ ব্যবহারকারীদের অসুবিধার কথা চিন্তা করে সরকার এখনই এসব ফোন বন্ধ করছে না, তবে সেগুলোকে ধূসর বা অবৈধ তালিকায় চিহ্নিত করার কাজ শুরু হয়েছে।

ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০২৪ সালের একটি প্রতিবেদনের বরাতে জানিয়েছেন, দেশের ডিজিটাল জালিয়াতির ৭৩ শতাংশই ঘটে অনিবন্ধিত বা অবৈধ ডিভাইসের মাধ্যমে। এ ছাড়া ২০২৩ সালের ইলেকট্রনিক গ্রাহক পরিচিতি বা ই-কেওয়াইসি জালিয়াতির ৮৫ শতাংশের পেছনে ছিল অবৈধ বা পুনঃপ্রোগ্রাম করা হ্যান্ডসেট।

পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৩ সালে ১ লাখ ৮০ হাজার ফোন চুরির রিপোর্ট হলেও প্রকৃত সংখ্যা কয়েক লাখ ছাড়িয়ে যাবে। অবৈধ ও ক্লোন আইএমইআই হওয়ার কারণে এসব ফোন চুরি হওয়ার পর পুলিশ বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষেও সেগুলো শনাক্ত করা বা উদ্ধার করা অসম্ভব হয়ে পড়েছে।

দেশের বাজারে বর্তমানে আন-অফিশিয়াল বা অপ্রাতিষ্ঠানিক ফোনের নামে দেদার নকল ও ক্লোন ফোন বিক্রি হচ্ছে। অনেক সময় দামি স্মার্টফোনের হুবহু নকল তৈরি করে নামী ব্র্যান্ডের লোগো ব্যবহার করে গ্রাহকদের প্রতারিত করা হচ্ছে। বিটিআরসি ও মোবাইল অপারেটরগুলো এখন ইন্টারনেট অব থিংস ডিভাইস এবং মোবাইল হ্যান্ডসেটের আইএমইআই আলাদা করার কাজ শুরু করেছে যাতে বৈধভাবে আমদানিকৃত ডিভাইসগুলো আলাদা করা যায়। এই প্রক্রিয়ার সাথে যুক্ত সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীলগণ হলেন, বিটিআরসির কারিগরি বিশেষজ্ঞ এবং মোবাইল অপারেটরদের প্রতিনিধিদল।

সরকার এই মুহূর্তে লাখ লাখ নাগরিকের সচল ফোন হুট করে বন্ধ করে দিয়ে কোনো বিশৃঙ্খলা তৈরি করতে চায় না। তবে আইএমইআই জালিয়াতির এই শিকড় অনেক গভীরে। ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব মনে করেন, ডিজিটাল জালিয়াতি ও চুরি হওয়া ফোনের বাজার বন্ধ করতে হলে এই নকল ফোনের লাগাম টানা জরুরি। সামনের দিনগুলোতে এনইআইআর ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করে কেবল বৈধভাবে নিবন্ধিত ফোনকেই নেটওয়ার্কে পূর্ণ সুযোগ দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। মোবাইল হ্যান্ডসেট এখন আর কেবল শৌখিনতার বস্তু নয়, এটি জীবনের একটি অপরিহার্য অংশ। কিন্তু আপনার হাতে থাকা স্মার্টফোনটি যদি নকল হয়, তবে তা কেবল আপনার টাকা নয়, বরং আপনার ব্যক্তিগত নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্যকেও হুমকির মুখে ফেলছে।

সরকার ও সচেতন নাগরিকদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এই নকল ফোনের বাজার নির্মূল করা এখন সময়ের দাবি। নতুন ফোন কেনার সময় অবশ্যই প্যাকেটের আইএমইআই নম্বরটি বিটিআরসি-এর তথ্যভাণ্ডারে যাচাই করে নিন। অবৈধ বা অপ্রাতিষ্ঠানিক ফোনের মাধ্যমে আপনার ব্যক্তিগত তথ্য পাচার ও ডিজিটাল জালিয়াতির ঝুঁকি থাকে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


ফেসবুকে আমরা