আজ আখেরি চাহার শোম্বা হলো ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের পালিত অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ একটি স্মারক দিবস। আখেরি চাহার শোম্বা একটি আরবি ও ফারসি শব্দ-যুগল; এর আরবি অংশ আখেরি, যার অর্থ শেষ এবং ফারসি অংশ চাহার শোম্বা, যার অর্থ বুধবার।
২৩ হিজরির শুরুতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। ক্রমেই তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হতে থাকে। তিনি এতটাই অসুস্থ হয়ে পড়েন যে, নামাজের ইমামতি পর্যন্ত করতে পারছিলেন না। ২৫ সফর বুধবার আমাদের প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলাইহি ওয়াসাল্লাম উম্মতের ব্যথায় ব্যথিত শোকাহত থেকে সুস্থ হয়ে ওঠেন। দিনটি ছিল সফর মাসের শেষ বুধবার।
এই দিন কিছুটা সুস্থবোধ করায় প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলাইহি ওয়াসাল্লাম গোসল করেন এবং শেষবারের মত নামাজে ইমামতি করেন। মদীনাবাসী এই খবরে আনন্দ-খুশিতে আত্মহারা হয়ে গেলেন এবং দলে দলে এসে প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে একনজর দেখে গেলেন। সকলে তাদের সাধ্যমতো দান-সাদকা করলেন, শুকরিয়া নামাজ আদায় ও দোয়া করলেন।
উল্লেখ্য যে, ২৬ শে সফর তিনি আবার অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং তার মাত্র ৫ দিন পর পরবর্তী সোমবার ১ লা রবিউল আউয়ালে আমাদের প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলাইহি ওয়াসাল্লাম পর্দা মোবারক করেন । মহান আল্লাহর সান্নিধ্যে মিলিত হলেন ।
কিছু নির্দিষ্ট বিধি-বিধানের আলোকে ‘আখেরি চাহার শোম্বা’ পালন করা হয়; যদিও ধর্ম-তত্ত্ববিদগণের মধ্যে এই দিবসটি পালন করা নিয়ে কিছুটা মতভেদ রয়েছে।
দিবসটি মূলতঃ ‘শুকরিয়া দিবস’ হিসাবে পালিত হয়; যাতে সাধারণতঃ গোসল করে দু’রাকাত শোকরানা-নফল নামাজ আদায় শেষে রোগ থেকে মুক্তির দোয়া ও দান-খয়রাত করা হয়। বিভিন্ন মসজিদ, মাদরাসা, দরবার, খানকায় ওয়াজ-নসিহত, জিকির-আজকার, মিলাদ মাহফিল, দোয়া ও মোনাজাত অনুষ্ঠিত হয় এই দিনটি পালন উপলক্ষে। এদিন বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সরকারিভাবে বন্ধ রাখার পাশাপাশি অফিস-আদালতে ঐচ্ছিকভাবে ছুটির দিন হিসাবে বিবেচনা করা হয়।[৪]
হাদিসের আলোকে,আখেরি চাহার সোম্বা
সফর মাসের শেষ বুধবার ছিল ২৫ তারিখ। এদিন নবি করিম (স:)একটু অসুস্থতা কমে গেল। তিনি সকাল বেলা উঠেই হযরত মা আয়শা কে ডেকে বললেন, আমার জ্বর কমে গেছে তুমি আমাকে গোসল করিয়ে দাও। সেমতে তাঁকে গোসল করানো হলে। তিনি সুস্থ্য বোধ করলেন। এটাই ছিল দুনিয়ার শেষ গোসল। ইমাম হাসান, ইমাম হোসাইন ও বিবি ফাতিমাকে ডেকে আনা হলো। নাতিদ্বয়কে নিয়ে তিনি সকালের নাস্তা করেন। হযরত বেলাল সুফফাবাসীগণ বিদ্যুতের ন্যায় এ সংবাদ মদীনার ঘরে ঘরে ছড়িয়ে দিলেন। সাহাবায়ে কেরামের মধ্যে আনন্দের ঢেউ খেলে গেল। তারা বাঁধ ভাঙ্গা স্রোতের মত দলে দলে আসতে লাগলেন এবং হযরত রাসূল (সাঃ)কে এক নজর দেখার জন্য উদগ্রীব হয়ে রইলেন।
হুযুরের রোগ মুক্তির সংবাদে সাহাবায়ে কেরাম কত খুশি ও আনন্দিত হয়েছিলেন তার কিছুটা আন্দাজ করা যায় কিছু ঘটনার মাধ্যমে। হযরত আবু বকর পাঁচহাজার দিরহাম ফকির মিসকীনদের মধ্যে বিলিয়ে দিলেন।
হযরত ওমর দান করলেন সাত হাজার দিরহাম। হযরত ওসমান দান করলেন ১০ হাজার দিরহাম।
হযরত আলী দান করলেন ৩ হাজার দিরহাম।
সবচেয়ে বেশী দান করলেন, ধনী ব্যবসায়ী হযরত আবদুর রহমান ইবনে আওফ তিনি একশত উট আল্লাহর রাস্তায় বিলিয়ে দিলেন। নবী করীম( সা:) এঁর একটু শান্তি ও আরামের সংবাদে সাহাবীগণ কীভাবে জান-মাল উৎসর্গ করে দিতেন এটা তারই আংশিক প্রমাণ। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস প্রতি বৎসর ঈদে মীলাদুন্নবীর দিনে একটি মূল্যবান লাল উট জবাই করে যেয়াফত দিতেন” (বা সাআদাতে আবাদিয়া, তুরস্ক দ্রষ্টব্য)।
নবি করিম (সা:) এঁর সাময়ীক রোগ মুক্তির দিবসকে চিরস্মরণীয় করে রাখার জন্য পারস্যসহ মধ্য এশীয়া পাক ভারত উপমহাদেশে অত্যন্ত ভাবগম্ভীর পরিবেশে এই দিবসটি পালন করা হয়।
আউলিয়ায়ে কেরামের ত্বরিকা অনুযায়ী এ দিনে হযরত রাসুল (সা:)-এঁর স্মরণে এবং রোগ বালাই থেকে মুক্তির নিয়তে আখেরি চাহার শোম্বা দিবসে গোসল করে দুই রাকাত শুকরিয়া নামায আদায় করা হয়। এছাড়াও বৈধ সমস্ত নেক আমল করা হয়।
আখেরী চাহার শোম্বা বা সফরের শেষ বুধবার দিবসটি পালন করে মুসলমানরা ইসলামের একটি স্মরণীয় দিনকে এখনো প্রেরণার উৎস করে রেখেছে। মূলতঃ এসব অনুষ্ঠানের মাধ্যমেই ইসলামী জোশ বারবার চাঙ্গা হয়ে উঠে। কিন্তু পরিতাপের বিষয় এই যে, নবী করীম(স:)-এর স্মৃতি বিজরীত এই দিবসটি পালন করতে এক শ্রেনীর ওলামা নিষেধ করেন। এবং এটাকে বিদ’আত বলে মানুষকে ভয় দেখান। তাদের উদ্দেশ্য একটি- সেটি হলো, ইসলামের স্মরণীয় ঘটনাসমূহ মুসলমানদের হৃদয় থেকে মুছে ফেলা। নবি-অলিদের স্মৃতি বিজড়িত চিহ্ন সংরক্ষণ করা ও দিবস পালনের মধ্যে অজস্র কল্যাণ নিহিত রয়েছে।
এরি ধারাবাহিকতায় কিশোরগঞ্জ জেলা অষ্টগ্রাম উপজেলার, সদর ইউনিয়ন আলম দিঘীর পাড়ে, মরহুম আশেকে রাসূল বাবুল মিয়ার নিজ বাড়ি আশেকে রাসুল (স:) মঞ্জিলে, বিশেষ দোয়া ও মিলাদ মাহফিলের আয়োজন করা হয়েছে।
এ আর সুমন, কিশোরগঞ্জ।